কোটি টাকার সড়ক নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২৫ September ২০২৬ | ১৮:১১
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে চলমান একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগে স্থানীয়দের প্রতিবাদে একাধিকবার বন্ধ হয়েছে কাজ।
তবে এরপরও সেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এদিকে, অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারকে অবগত করার পাশাপাশি অনিয়মের প্রমাণ পেলে বিল ছাড় হবে না বলে জানিয়েছেন উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নের হারুঞ্জা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উত্তর ভাবকি গুচ্ছগ্রাম পর্যন্ত ১ হাজার ২৪৫ মিটার সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ইটের খোয়া, গুঁড়া ইট, রাবিশ ও মাটিযুক্ত খোয়া ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের দাবি, নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে আপত্তি জানালে কিছু নিম্নমানের খোয়া সরিয়ে নেওয়া হলেও পরে আবার একই ধরনের উপকরণ এনে কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এতে এক কোটি ৫৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য সড়কটির স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও এলজিইডির কর্মকর্তারা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, নিম্নমানের কোনো উপকরণ পাওয়া গেলে তা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং প্রকল্পের কাজ নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, হারুঞ্জা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উত্তর ভাবকি গুচ্ছগ্রাম পর্যন্ত ১ হাজার ২৪৫ মিটার সড়কটি পিচঢালাইয়ের উপযোগী করতে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। জয়পুরহাটের রাবা কনস্ট্রাকশন নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়ন করছে। গত বছরের মে মাসে কাজ শুরু হয় এবং চলতি বছরের মার্চে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরে আরো তিন মাস সময় বাড়ানো হয়েছে বলে জানানো হয়।
গত বুধবার দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের বিভিন্ন অংশে শ্রমিকেরা নির্মাণকাজ করছেন।
রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে ইটের খোয়া। এসব খোয়ার মধ্যে ভাঙা ও মাটিযুক্ত খোয়ার পাশাপাশি পোড়ামাটির মতো দেখতে ইটের টুকরাও রয়েছে। কোথাও কোথাও বড় আকারের ইটের টুকরা দেখা যায়। নির্ধারিত মান অনুযায়ী প্রায় ৫০ মিলিমিটার বা ২ ইঞ্চি আকারের ইটের খোয়া ব্যবহারের কথা থাকলেও কোনো কোনো স্থানে ৩ থেকে ৪ ইঞ্চি আকারের বড় ইটের টুকরা ব্যবহার করা হচ্ছে।
এসব খোয়া দিয়ে সড়কের মেকাডম বা বেজ তৈরির কাজও করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের শিডিউলে মাটি ভরাট, বেড প্রস্তুত, বক্স কাটিং, এজিং, ক্যাম্বারিং, বালু ভরাট, ব্রিক ফ্ল্যাট সলিং, হেরিং বোন বন্ড ও প্যালাসাইডিংসহ বিভিন্ন কাজের কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে সেগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের আগে গুণগতমান পরীক্ষা করে তা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদন নথিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দারা আরো অভিযোগ করেন, সড়কের বেড তৈরিতে ১, ২ ও ৩ নম্বর ইটের খোয়ার পাশাপাশি গড়াই ইটও ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব ইট সামান্য চাপ দিলেই গুঁড়া হয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ইটের গুঁড়া ও রাবিশজাতীয় উপকরণও মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। এ ছাড়া সড়কের কাজে ছয় ইঞ্চি বালু দেওয়ার কথা থাকলেও কোনো কোনো অংশে মাত্র এক ইঞ্চির মতো বালু দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল বলেন, কাজের মান নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। কিন্তু অভিযোগের পরও কাজ বন্ধ হয়নি। নিম্নমানের ইটের সঙ্গে রাবিশ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং প্রকৌশলীর উপস্থিতিতেই এসব উপকরণ দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
উত্তর ভাবকি গ্রামের বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, নিম্নমানের ইট ব্যবহার না করার জন্য ঠিকাদারকে একাধিকবার বলা হয়েছে। এমনকি নিম্নমানের ইটবোঝাই একটি ট্রাক ফিরিয়েও দেওয়া হয়েছিল। এরপরও একই ধরনের উপকরণ দিয়ে কাজ চলছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় সোনিয়া আক্তার বলেন, আমরা ৪০ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এখন পর্যন্ত কোনো রাস্তা হয়নি। এত বছর পর রাস্তা হচ্ছে, তাও কাজের মান খুব নিম্ন। ইটগুলো সব ভাঙা।
সাইদুল ইসলাম বলেন, এক কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের সড়কে খুবই নিম্নমানের খোয়া দিয়ে রাস্তার কাজ করা হচ্ছে। এমন নিম্নমানের খোয়া ব্যবহার করা হলে রাস্তার স্থায়িত্ব বেশি দিন থাকবে না। নির্মাণের পর দ্রুত রাস্তা নষ্ট হলে আবার জনগণের অর্থে সংস্কার করবে তারা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী মো. আব্দুল কাইয়ুম বলেন, সড়কের কাজে নিম্নমানের কোনো নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে না।স্থানীয়দের পক্ষ থেকে কোনো উপকরণের মান নিয়ে আপত্তি জানানো হলে প্রয়োজনে ওই উপকরণ সরিয়ে নতুন উপকরণ দিয়ে কাজ করা হবে। কোথাও কোনো ত্রুটি থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের নির্দেশনা অনুযায়ী তা সংশোধন করা হবে।
এলজিইডির উপসহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর বলেন, আমরা সবসময় চেষ্টা করছি যাতে কাজ ভালো হয়। সেখানে তদারকির জন্য সাইট ইঞ্জিনিয়ার থাকেন। কেউ অভিযোগ করলে নিম্নমানের সামগ্রী অপসারণের জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কালাই উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, অনিয়মের বিষয়ে ঠিকাদারকে ইতিমধ্যে জানানো হয়েছে। ঠিকাদার নিম্নমানের সামগ্রী আনলে আমরা তা সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে ঠিকাদারই আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। নিম্নমানের কাজের প্রমাণ পেলে বিল দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
- বিষয় :