সীতাকুণ্ড পৌরসভার ওয়েবসাইট ক্লোন করে জাল ওয়ারিশ সনদ, সিল-স্বাক্ষর নকলের অভিযোগ
রাফিদুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ September ২০২৬ | ১১:৫৮
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সরকারি পোর্টালের আদলে ক্লোন ওয়েবসাইট তৈরি করে কিউআর কোড সংবলিত ডিজিটাল ওয়ারিশ সনদ তৈরির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সিল-স্বাক্ষর নকল করে ওই সনদে ব্যবহার করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। জাল সনদ ব্যবহার করে ৫৭ দশমিক ৪৫ শতক পৈতৃক সম্পত্তি নামজারি করে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পৌর কর্তৃপক্ষ বলছে, তদন্তে সনদটি ভুয়া প্রমাণিত হওয়ায় তা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। জাল সনদ তৈরির ঘটনায় পৌরসভা বাদী হয়ে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পৌরসভা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শিবপুর এলাকার মৃত মো. খায়রুল্লাহর কন্যা হাছিনা বেগমের বিরুদ্ধে এর আগেও ওয়ারিশ সনদে তথ্য গোপন ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। ২০০১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে পৌরসভার নথিতে একাধিক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
নথি অনুযায়ী, ২০০১ সালের ১৫ ডিসেম্বর হাছিনা বেগম তাঁর জ্যেষ্ঠ বোন হাছিনা বানুর নাম উল্লেখ না করে নিজেকে একমাত্র ওয়ারিশ দাবি করে একটি ওয়ারিশ সনদ নিয়েছেন—এমন অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড পৌরসভায় ৮৫/২০০২ নম্বর মামলা হয়। তদন্তের পর ২০০২ সালের ২৩ অক্টোবর ওই সনদ বাতিল করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পৌরসভার আরেকটি প্রত্যয়নপত্র অনুযায়ী, ২০১০ সালের ২৬ জুলাইও তথ্য গোপনের অভিযোগে হাছিনা বেগম একটি ওয়ারিশ সনদ নেন। সনদটির স্মারক নম্বর ছিল সীঃপৌঃ/প্রশা:/এক-১৯৭/৮-২০১০/ ৪৯৮। পরবর্তীতে তৎকালীন ওয়ার্ড কাউন্সিলর জুলফিকার আলী মাসুদের তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়ার পর সনদটি জব্দ ও বাতিল করা হয় বলে পৌরসভার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই হাছিনা বেগম পুনরায় ওয়ারিশ সনদ নেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় হাছিনা বানুর আপত্তির পর শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং তৎকালীন পৌর প্রশাসক আবেদনটি বাতিল করেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় আদালতে সি.আর. মামলা নং ৬৫বি/২০২৫ দায়ের করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাবি, জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে এবং মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
ক্লোন ওয়েবসাইটে ডিজিটাল সনদ তৈরির অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আগের ঘটনাগুলোর পর এবার ডিজিটাল পদ্ধতিতে ওয়ারিশ সনদ জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে। সীতাকুণ্ড পৌরসভার অনুমোদিত পোর্টাল “sitakunda.prottoyon.net”-এর আদলে একটি নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে সেখান থেকে ১২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ দেখিয়ে ১০৪৪৪৬ নম্বরের একটি ডিজিটাল ওয়ারিশ সনদ তৈরি করা হয়।
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ওই সনদে সীতাকুণ্ডের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম এবং সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলামের সিল-স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়েছে।
সনদে ১৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ইউএনওর স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে বলেও অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে। তাদের দাবি, ওই দিন পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সরকারি ছুটি ছিল। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব বলে তারা জানিয়েছেন।
৫৭.৪৫ শতক জমি নামজারির অভিযোগ
অভিযোগের আরও গুরুতর দিক হলো, ওই ডিজিটাল সনদকে প্রকৃত সনদ হিসেবে ব্যবহার করে সীতাকুণ্ড উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে নামজারির আবেদন করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারী পক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিবপুর মৌজার আরএস/বিএস দাগ নম্বর ৮০৮, ৮১১, ৮১৩, ৮২৩, ৮২৫, ১৩৯৮, ১৪৫৪, ১৪২৬, ১৪৩৩ ও ১৪৩৬-এর অন্তর্ভুক্ত মোট ০.৫৭৪৫ একর বা ৫৭ দশমিক ৪৫ শতক পৈতৃক জমি নামজারির চেষ্টা করা হয়।
তাদের দাবি, এ বিষয়ে নামজারি খতিয়ান নম্বর ২০২৬-১০০০৩৩ এবং মিউটেশন কেস নম্বর ২২৫/২০২৬-২৭-এর অনুমোদনের তারিখ ১০ আগস্ট ২০২৬।
অভিযোগকারী অ্যাডভোকেট মো. আলী আজমের দাবি, এর মাধ্যমে মৃত মো. খায়রুল্লাহর অপর ওয়ারিশ হাছিনা বানুকে সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি হাছিনা বানুর পক্ষে ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ডকেট নম্বর ৫২৫ মূলে পৌর প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
তদন্তে সনদ বাতিল
অভিযোগ পাওয়ার পর পৌরসভার পক্ষ থেকে বিষয়টি তদন্ত করা হয়। পৌর নির্বাহী কর্মকর্তার তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১০৪৪৪৬ নম্বরের ওয়ারিশ সনদটি বাতিল করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে জানা যায়।
অভিযোগকারী পক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পৌরসভার স্মারক নং সীঃপৌঃ/২০২৬/১৭৮-এর মাধ্যমে সনদটিকে ভুয়া, অবৈধ ও আইনত অস্তিত্বহীন ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্মারক নং সীঃপৌঃ/২০২৬/১৭৯-এর মাধ্যমে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়কে ওই সনদের ভিত্তিতে কোনো নামজারি বা দলিল রেজিস্ট্রি না করার বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া স্মারক নং সীঃপৌঃ/২০২৬/১৭৬-এর মাধ্যমে হাছিনা বেগমকে মূল সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রসহ হাজির হওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি হাজির হননি বলে পৌরসভা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
কর্মকর্তাদের বক্তব্য
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, “পৌরসভার প্যাড ও সিল ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো আমাদের স্বাক্ষর নয়। আমাদের স্বাক্ষর জাল করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে নামজারিটি বাতিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সনদ জালকারীর বিরুদ্ধে পৌরসভা বাদী হয়ে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে।”
পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “তদন্ত করে আমরা সনদটি জাল পেয়েছি। সনদটি বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। সনদ জালকারীর বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য সনদ বিতরণের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি কেন মামলা নিয়ে থানায় যাচ্ছেন না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সময় চেয়েছেন।”
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, “পৌর ওয়ারিশ সনদে আমার একটি স্বাক্ষরের দায়িত্ব রয়েছে। তবে এই সনদে আমি স্বাক্ষর করিনি। আমার স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। আমি কোর্টে মামলা করার পরামর্শ দিয়েছি। এরপরও কেউ মামলা করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অন্যদিকে, সীতাকুণ্ড পৌরসভার সার্টিফিকেট প্রদানকারী ওয়েবসাইট পরিচালনার দায়িত্বে থাকা মো. মহিউদ্দিনের কাছে ক্লোন ওয়েবসাইটে কীভাবে প্রবেশ করা হলো, এতে তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না এবং পৌর নির্বাহী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে এজাহার তৈরির নির্দেশ দেওয়ার পরও তিনি থানায় কেন যাননি—এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এসব কিছু জানি না, অবগত নই। তাই মামলা করতে চাইনি। বিস্তারিত বুঝে সিদ্ধান্ত নেব।”
পৌর প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসকের পক্ষ থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারী পক্ষের দাবি, ক্লোন ওয়েবসাইটটি কে তৈরি করেছে, কোন ডিভাইস বা আইপি ঠিকানা থেকে সেটি পরিচালিত হয়েছে, সিল-স্বাক্ষর কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং জাল সনদের ভিত্তিতে নামজারি প্রক্রিয়ায় কীভাবে নথিটি গ্রহণ করা হলো—এসব বিষয় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
- বিষয় :