ঢাকা সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

সর্বশেষ
সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে চায় সরকার: রিজভী icon ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের প্রস্তাব নাকচ করলেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ icon মন্ত্রিসভার যেকোনো সদস্যকে পদত্যাগ করতে বলার বৈধ ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে: অ্যাটর্নি জেনারেল icon আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়াম দেখে সন্তুষ্ট বিসিবি, এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের অপেক্ষা  icon মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ icon ‘জমি দখল-চাঁদা তুলতে যাইনি, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছি’: সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক icon ১০০ ফিট সড়ক দখলে, জনদুর্ভোগ দেখার সময় নেই কর্তৃপক্ষের? icon ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী icon আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলে জুলাই শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা করা হবে: প্রধানমন্ত্রী icon জুলাই একদিনে সংঘটিত হয়নি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ

ঢাকা-রিয়াদ ফ্লাইট বাতিলে চরম বিপাকে বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধারা


                            ঢাকা-রিয়াদ ফ্লাইট বাতিলে চরম বিপাকে বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

স্টাফ রিপোর্টার

প্রকাশ: ১৯ October ২০২৬ | ১১:২৭

রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলার জেরে সৌদি আরবগামী ফ্লাইট একের পর এক বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি কর্মীরা। ছুটিতে দেশে আসা কর্মীরা কাজে ফিরতে পারছেন না। যাত্রা পিছিয়ে যাওয়ায় তাদের ভিসার মেয়াদ ও চাকরি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

গতকাল রবিবার বিকাল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ জনেরও বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। সরেজমিনে বিমানবন্দরে দেখা যায়, রিয়াদগামী যাত্রীরা হাতে টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে খোঁজখবর নিচ্ছেন। কেউ ফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলছেন, কেউ ট্রলির ওপর মালাপত্র নিয়ে অসহায় বসে আছেন, কেউ-বা আবার বিকল্প ফ্লাইটের সন্ধান করছেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা অন্য পরিবহনে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসার পর ফ্লাইট বাতিলের খবর পেয়ে অনেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

তাদেরই একজন টাঙ্গাইলের মীর্জাপুরের মালেক। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ২ নম্বর টার্মিনালে ট্রলি নিয়ে বিরস ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে-মুখে দুশ্চিন্তার মেঘ। জানতে চাইলে ইত্তেফাককে তিনি বললেন, ‘এক মাসের ছুটিতে এসেছিলাম। ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে প্রথম টিকিট ক্যান্সেল হয়েছে। এখন দুবাই হয়ে মদিনায় যাচ্ছি। এতে ৮০ হাজার টাকা বাড়তি দিয়ে যেতে হচ্ছে। কারণ যদি যেতে না পারি মরণ ছাড়া গতি নেই।’

কুমিল্লার চান্দিনার মো. শরীফ সরকার বলেন, ‘তিন মাসের ছুটিতে বাড়ি এসেছি। আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে আর যেতে পারব না। চাকরি হারানোর ভয়ে এজন্য তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছি। কিন্তু (রবিবার)  এয়ারপোর্টে এসে শুনি সকাল ১১টায় রিয়াদ-দাম্মাম ফ্লাইটটি ক্যান্সেল হয়ে গেছে। আবার জানানো হলো রাত সাড়ে ৮টার ফ্লাইটে মদিনা হয়ে দাম্মাম নেওয়া হবে।’ হতাশ কণ্ঠে মো. শরীফ সরকার বলেন, ‘যাইতে পারি কি না আল্লাহ জানেন।’

নাটোরের বড়াই গ্রামের আতিকুল ইসলাম চাকরি নিয়ে প্রথম বারের মতো সৌদি আরব যাচ্ছেন। গত ১২ অক্টোবর বিমানবন্দরে এসেই জানতে পারেন তার ফ্লাইট ক্যান্সেল হয়ে গেছে। গতকাল রবিবার দ্বিতীয় দফায় এসেও জানতে পারেন ফ্লাইট কখন কটায় ছাড়া হবে তা অনিশ্চিত। অগত্যা বাবা আদম আলীকে ব্যাগ অ্যান্ড ব্যাগেজসহ ট্রলির ওপর বসিয়ে রেখে ছুটলেন গুলশান-২ এ গালফ এয়ারের অফিসে। আদম আলী জানান, ‘আমি কৃষক মানুষ অনেক আশা নিয়ে আমার সর্বস্ব দিয়ে ছেলেকে বিদেশে পাঠাচ্ছি। যদি যেতে না পারে আমার ছেলের আকামা থাকবে না। আমার মুখের ভাষা বন্ধ হয়ে যাবে।’

প্রায় দুই ঘণ্টা পর ফিরে এসে আতিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে জানান, রাত ৮টায় তার ফ্লাইট এবং অন্য রুট হয়ে যাওয়া হবে।

কুমিল্লার বামন পাড়ার মো আসাদ বলেন, ‘সৌদি এয়ারলাইন্সে রাত ১১টায় আমার ফ্লাইট ছিল। কিন্তু আমি জানিই না আমার ফ্লাইট ক্যান্সেল হয়েছে। যদি যাইতে না পারি তাহলে আমার সব ছারখার হয়ে যাবে।’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মো. মাইনুদ্দীন বলেন, ‘রাত ১টা ৪০ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইন্সে সরাসরি ফ্লাইট ছিল। কিন্তু তারা জানিয়েছে, দুবাই হয়ে মদিনা যেতে হবে। এতে করে বাড়তি ভাড়া গুনতে না হলেও চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।’

নোয়াখালী থেকে এসেছেন সৌদি আরবের রিয়াদ প্রবাসী আব্দুল মান্নান। দেশে ছুটি কাটিয়ে রবিবার দুপুরে তার ফেরার কথা ছিল। আগেই বিমানের টিকিট কেটে যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, তার ফ্লাইট বাতিল। এখন কবে কর্মস্থলে ফিরতে পারবেন, তা তিনি জানেন না। ঠিক সময়ে কাজে যোগ দিতে না পারলে চাকরি নিয়ে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে তার। আব্দুল মান্নান বলেন, ‘চার মাস আগে দেশে এসেছিলাম।  নোয়াখালী থেকে ঢাকায় এসে ফ্লাইট ধরার প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। এখন হঠাৎ ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছি। কবে যেতে পারব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি। সৌদি আরবে আমার জরুরি কাজ আছে। তারিখমতো ফিরতে না পারলে ভয়াবহ সমস্যায় পড়তে হবে। ফ্লাইটের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হলে আমাদের ভোগান্তি কিছুটা কমত।’

শরীফ সরকার, মালেক, আসাদ কিংবা আব্দুল মান্নানের মতো হাজার হাজার প্রবাসীর যাত্রা আটকে গেছে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতিতে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ বেবিচকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী ১১৮টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এতে এসব ফ্লাইটের ১৮ হাজার ৩৬২ যাত্রী ভোগান্তিতে পড়েছেন। এর মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ৫২টি এবং ট্রানজিট ফ্লাইট ৬৬টি। এসব ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা প্রবাসীরা। কেউ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় এসে বিমানবন্দরে আটকে গেছেন, কেউ বিকল্প পথে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করেও নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। এর মধ্যে বিকল্প রুটের টিকিটের দাম কয়েক গুন বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে আর্থিক চাপেও পড়েছেন যাত্রীরা।

জানতে চাইলে বেবিচকের সহকারী পরিচালক জনসংযোগ কাওছার মাহমুদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ফ্লাইট বাতিলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।’

এদিকে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে এবং ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা এড়াতে বিকল্প হিসাবে সৌদি আরবের দাম্মাম ও মদিনাগামী ফ্লাইটে যাত্রীদের পাঠানোর চেষ্টা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। আসন খালি থাকা সাপেক্ষে বিনা খরচে অন্য ফ্লাইটে যাত্রীদের সমন্বয় করা হবে। গত সোমবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তাদের বিকল্প ফ্লাইটে পাঠানোর চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, গত বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন। এ বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি কমে হয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে। শুধু সৌদি আরবে যাওয়ার ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ থেকে কমে হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭ জন। এই কমার হার প্রায় ৪৬ শতাংশ।

উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সৌদি আরবে গেছেন ৬ লাখের বেশি বাংলাদেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এই সময়ে দেশটি থেকে ৫৮৫ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের বছরের তুলনায় এটি ৩৭ শতাংশ বেশি।

আরও পড়ুন

×