‘বিদায় মেসি’—চাইলেই কি বলতে পারছেন আপনি
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ০৭ October ২০২৬ | ১২:৫৩
শেষবারের মতো দর্শক-সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নাড়াচ্ছেন মেসি।
বিদায়! চাইলেই বলা যায়। এ আর তেমন কি? একটি মাত্র শব্দই তো।
কিন্তু আসলেই কি তাই? বিশেষত আজকের এই দিনে। এক শব্দের এই বাক্যটি বলার আগে কোথাও কি আপনার টান পড়ছে না? নাকি অন্য সময়ের মতো ঠোঁটে সহজেই বসে যাচ্ছে। বলতে গিয়ে এক ধরনের গভীর শূন্যতা কি অনুভব করছেন না? কিংবা হাহাকার। ঘর ছেড়ে আপন মানুষ দূরে সরে যাওয়া কিংবা হারিয়ে ফেলার সেই হাহাকার।
আজ যদি এক ফোঁটাও এমনটা অনুভব হয় তাহলে নিশ্চয়ই মেসিকে বিদায় বলাটা আপনার জন্য সহজ নয়। আপনি যতই শক্তিশালী, দৃঢ়-ইস্পাত কঠিন তাঁর ভক্ত-সমর্থকই হোন না কেন? এমনকি তাঁর প্রতিপক্ষও যদি হন।
ফুটবল ভালোবাসলে নিশ্চিতভাবেই আপনার অজান্তে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবে। প্রতিপক্ষ হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর জাদুকরী মুহূর্তগুলো আবার দেখতে না পারার আক্ষেপে।
আর আপনি যদি তাঁর ভক্ত-সমর্থক হন তাহলে তো কথাই নেই।
এই মন খারাপের দিনে স্মৃতিতে ডুবে যাবেন। নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন পুরোনো দিনে। সেই লম্বাচুল, লাজুক মুখায়ব থেকে শুরু করে কোপা আমেরিকা-বিশ্বকাপ-ব্যালন ডি’অর জয় কিংবা ট্রফি হাতছাড়া হওয়ার পর শিশুর মতো তাঁর সেই কান্না আরো কত কিছুতে যে ডুবে থাকবেন তার ইয়াত্তা নেই।
তাঁর খেলা দেখার জন্য রাত জেগে কত অপেক্ষায় ছিলেন সে সব স্মৃতি ভিড়বে আপনার মগজে।
তবে শত কষ্ট-যন্ত্রণা নিমিষেই নাই করে দিতেন পারতেন মেসি। কোনো এক জাদুবলে। তার জন্য অপেক্ষা ছিল শুধুই রেফারির কিক অফের বাঁশি বাজানো। বাঁশি থামতেই যেন আনমনে শরীরে এক শিহরণ জাগত। এই বুঝি বল পায়ে জাদুকরী কিছু করে বসছেন তিনি। সেটা হোক গোল কিংবা অ্যাসিস্ট। দুটোর কোনোটিও যদি না হয়, অন্তত বল পায়ে শরীরের নাচনে প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর মুহূর্তও চোখে-মনে প্রশান্তি এনে দিতো।
আজ সবকিছুরই থেমে যাওয়ার পালা। কেননা মূল চরিত্রের থামার সময় এসেছে। যেমনটা ‘দুজন’ কবিতায় রূপসী কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছেন, ‘প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়।’ তেমনি ফুবটবলের নক্ষত্র লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিত্তিনিরও সময় হাজির । আজকের পর তাই চাইলেও আর আন্তর্জাতিক ফুটবলে বল পায়ে দেখা যাবে না দুনিয়া জুড়ে পরিচিত লিওনেল মেসি নামের এই জাদুকরকে। আনমনে শুধু স্মৃতির পাতা উল্টাতে উল্টাতে নস্টালজিয়াই হতে হবে।
তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল দিয়ে মানুষের মনে জায়গা পাওয়াটা সহজ ছিল না মেসির। যতটা না বার্সেলোনার হয়ে পেরেছেন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে যে কোনোভাবেই সাফল্য ধরা দিচ্ছিল তাঁর কাছে। সুযোগ যথেষ্টই পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যদেবী মুখ তুলে তাকায়নি তার দিকে। তা না হলে তিন বছরের ব্যবধানে বিশ্বকাপ-কোপা আমেরিকা মিলিয়ে তিনটি ফাইনাল হারার কষ্ট সইতে হবে কেন খুদে জাদুকরকে। ২০১৬ সালের ২৬ জুন দুঃখে-অভিমানে অবসরও নিতে হয়েছিল ৮ বারের ব্যালন ডি’অর জয়ীকে।
৪৭ দিন পর ফিরলেন কয়েকগুণ শক্তিশালী হয়ে। এবার মেসিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। উল্টো চক্ষুশূলদেরই চোখের মণি হন তিনি। একের পর এক প্রাপ্তি যোগ হয় তাঁর খাতায়। সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০২২ বিশ্বকাপে আজন্ম স্বপ্ন পূরণের মধ্যে দিয়ে। সোনালি ট্রফির আগে-পরে জেতেন কোপা আমেরিকাও। না পাওয়ার সব হিসেব চুকে অমরত্বের সাক্ষাৎ পান তিনি। অন্তত জনপ্রিয় ধারভাষ্যকার পিটার ডুরির মতে তাই মনে হয়। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জয়ের পর ব্রিটিশ ধারাভাষ্যকার বলেছিলেন, ‘লিওনেল মেসি তাঁর শেষ চূড়া জয় করেছেন। স্বর্গের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন।’ তাঁর নেতৃত্বে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালেও উঠেছিল আর্জেন্টিনা । তবে স্পেনের কাছে ১-০ ব্যবধানে হারায় টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতা হয়নি মেসির।
সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই বাবা হোর্হে মেসিকেও হারিয়ে বসেন মেসি। বাবাকে হারানোর ২৩ দিন পর ডায়েরির তিনটি ছেঁড়া পাতা ও একটি কলমের ছবি সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করে নিজের অবসরের ঘোষণা দেন ৩৯ বছর বয়সী প্লে মেকার। তবে আর্জেন্টিনা অধিনায়কের এমন বিদায় মেনে নিতে পারেননি ভক্ত-সমর্থকরা কেউই।
নিজেদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের বিদায় ঘরের মাঠ থেকে হোক এমনটাই ছিল সকলের চাওয়া। সেই চাওয়াই আজ পূর্ণ হলো। বুয়েনস এইরেসের মনুমেন্তালে শেষবারের মতো মেসিকে দেখার শেষ সুযোগ পেল। ৮৫ হাজারের বেশি দর্শক শেষবার তাঁর পায়ের জাদুর সাক্ষী হলো। আর বোকাবাক্সের দুনিয়ায় অগণিত ফুটবলপ্রেমী।
মেসিকে বিদায় জানাতে মনুমেন্তাল সেজেছিল বর্ণিল সাজে। ম্যাচ শেষে ড্রোন শোয়ে ফুটে তোলা হয় তাঁর ক্যারিয়ার। আর জন্মশহর রোজারিওর ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ মেমোরিয়ালে মেসির ৩০ মিটার লম্বা বিশেষ জার্সি তৈরি করা হয়েছিল। যেতে যেতেও সবাইকে আরেকবার মুগ্ধ করলেন মেসি। বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে জোড়া অ্যাসিস্ট ও গোল করে। পেনাল্টিতে পাওয়া গোলটি তার ক্যারিয়ারের ১২৬তম। আর্জেন্টিনার হয়ে রেকর্ড।
তাই মেসির বিদায়টা শুধুই একজন ফুটবলারের নয়, একটা যুগের অবসান। যার নাম ‘মেসি যুগ’। প্রকৃতপক্ষে মেয়াদ ২১ বছরের হলেও যা টিকে রইবে অনন্তকাল!
- বিষয় :